s1

মোঃ আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল এর সম্পাদকীয় বক্তব্য

সিলেট আমাদের প্রাণেরবিভাগ। বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক অঞ্চল এই সিলেট। পৌরাণিক যুগে এই অঞ্চল প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই যুগে সিলেটের লাউড় পর্বতে শহর সিলেট অঞ্চল বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। দ্বাদশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলের কিছু অংশ বিক্রমপুরের রাজ্য ভুক্ত হলে দিল্লীর সুলতানদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন আউলিয়া শাহজালালের নামের সাথে মিল রেখে গৌড় নামের পরিবর্তে এর নামকরণ করা হয় জালালাবাদ। সেই থেকে সিলেটকে জালালাবাদ হিসেবেই অভিহিত করা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক প্রারম্ভ থেকেজালালাবাদের রয়েছেঅনন্য ভূমিকা। ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক থেকে এ অঞ্চল অনেক সমৃদ্ধ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জালালাবাদের লোকজন বসবাস করে থাকেন। বৃহত্তর অর্থে সিলেট বিভাগের চাটি জেলার মানুষকেই জালালাবাদ অঞ্চলের মানুষ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এছাড়াও বিখ্যাত কিছু মানুষ নিজের নামের সঙ্গে জালালাবাদী যুক্ত করে থাকে। এ হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেটবাসীকে জালালাবাদ অঞ্চলের মানুষ হিসেবেই সবচেয়ে বেশি সম্বোধন করা হয়। এ অঞ্চলের মানুষ যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-চিকিৎসা-ব্যবসা- বাণিজ্য-রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনন্য অবদান রেখেছেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শীতা, উন্নত জীবনবোধ, পরিশীলিত মনোভাব এবং সর্বোপরি মানবতার কল্যাণে কাজ করার প্রবল ইচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষকে অনন্য সম্মানে ভূষিত করেছে। এছাড়া সিলেট বিভাগের এ চারটি জেলার মানুষের মধ্যকার যে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, হৃদ্যতা এবং আন্তরিকতা সবার কাছে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ রেখে পথচলার উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন জালালাবাদবাসী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বৃহত্তর সিলেটের প্রবাসীদের পারস্পরিক হৃদ্যতা,ভালোবাসা এবং মানবকল্যাণে একীভূত হয়ে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে 'গ্লোবাল জালালাবাদ এসোসিয়েশন'- এর যাত্রা শুরু হয়। এ সংগঠন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা জালালাবাদবাসীকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশের বৃহত্তর সিলেটবাসীর মধ্যে নতুন সংযোগ সৃষ্টি করতে এ সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করছে। এছাড়া প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা এ সংগঠনের সাথে নিজেদেরকে সংযুক্ত করছেন। এ সংযোগকে অব্যাহত রাখার জন্য প্রতি বছর 'গ্লোবাল জালালাবাদ এসোসিয়েশন' বিভিন্ন দেশে গ্লোবাল জালালাবাদ উৎসব করে থাকে। এটি বিশ্বব্যাপী সিলেটের প্রবাসীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শুরুতে এ সংগঠনের উদ্যোগে লন্ডন শহরে চারদিন ব্যাপী 'গ্লোবাল জালালাবাদ উৎসব'-এর আয়োজন করা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা সিলেটিরা এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই উৎসব জালালাবাদবাসীর অন্তরে হৃদ্যতা এবং মিলনমেলার এক ঐকান্তিক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছিল এক মিলনমেলার। জালালাবাদ এসোসিয়েশন ইউকে'র প্রেসিডেন্ট মুহিবুর রহমান মুহিব-এর উদ্যোগে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকায় একটি অভিজাত হোটেলে 'আন্তর্জাতিক জালালাবাদ উৎসব' আয়োজন করা হয়। বিশ্বের ১৬টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এবং সিলেটের অনেক মন্ত্রী, এমপি, উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের জালালাবাদ এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দসহ প্রবাসী সিলেটি নেতৃ বৃন্দের অংশগ্রহণে উৎসবটি সফল ও সার্থক হয়। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেটি প্রবাসীরা যুক্তরাজ্যর জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনএর প্রেসিডেন্ট মুহিবুর রহমান মুহিব-এর নেতৃত্বে 'আন্তর্জাতিক জালালাবাদ এসোসিয়েশন' গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

মুহিবুর রহমান মুহিবএর নেতৃত্বে লন্ডন থেকে ২০জন গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, যারা লন্ডনের বিভিন্ন সামাজিক গ্লোবাল জালালাবাদ এসোসিয়েশন। ৩ ব্যবসায়ীক সংগঠনের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আহমদ উস সামাদ চৌধুরী জেপি, ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম বাসন, মাহবুবুর রহমান, আমিনুল হক জিলু, মোঃ আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল (এই নিবন্ধকার), সৈয়দ সাদেক আহমদ, আব্দুল অদুদ দিপক, দিলওয়ার হোসেন, শামীম আহমদ, জুবায়ের আহমেদ প্রমুখ। ঢাকায় অনুষ্ঠিত উৎসবে সকল দেশের জালালাবাদবাসীর অংশগ্রহণে 'আন্তর্জাতিক জালালাবাদ এসোসিয়েশন' গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরপর মুহিবুর রহমান মুহিব-এর নেতৃত্বে সংগঠন করার জন্য যাবতীয় কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। সবার সাথে পরামর্শে গঠন করা হয় ওয়ার্কিং কমিটি। সবার মতামতের ভিত্তিতে সংগঠনের নাম 'গ্লোবাল জালালাবাদ এসোসিয়েশন' করার প্রস্তাব আসে। এসময় জালালাবাদ এসোসিয়েশন ইউকে'র প্রেসিডেন্ট মুহিবুর রহমান মুহিবকে আহবায়ক ও জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা, ইনক-এর প্রেসিডেন্ট ময়নুল হক চৌধুরী হেলালকে সদস্য সচিব করে একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন-যুগ্ম আহবায়ক কাপ্তাই হোসেন, দেবব্রত দে তমাল, মোহাম্মদ কয়েস আহমেদ, সদস্য হিসেবে রাখা হয় আবুল কালাম আজাদ ছোটন, মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও অলি উদ্দিন শামীমকে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে মুহিবুর রহমান মুহিবকে প্রেসিডেন্ট, ময়নুল হক চৌধুরী হেলালকে সেক্রেটারি এবং রফিকুল হায়দারকে ট্রেজারার করে বিশ্বের ২০টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে গ্লোবাল জালালাবাদ এসোসিয়েশন-এর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।

এই কমিটিকে নিয়ে ১৯ মার্চ (২০২৩) অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। আগেই বলেছি- সে সময় চারদিনব্যাপী লন্ডনে প্রথম আন্তর্জাতিক জালালাবাদ উৎসব ২০২৩ অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এছাড়া এ অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গ্লোবাল জালালাবাদ এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। প্রথম আন্তর্জাতিক জালালাবাদ উৎসবে ব্রিটেনের সদ্য প্রয়াত রানীর পক্ষ থেকে খেতাবপ্রাপ্ত দুইজন গুণীজনকে বিশেষভাবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তারা হচ্ছেন-বাংলাদেশ ক্যাটারার এসোসিয়েশন-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম অবিই ও লন্ডন টাইগার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ এক্সিকিউটিভ মিসবাহ আহমদ এমবিই। ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত স্পেন কেবল ভৌগোলিক সৌন্দর্যের দেশ নয়, এটি একসময়ে ছিল মুসলিম সভ্যতা ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান লীলাভূমি। মধ্যযুগে স্পেনের নাম ছিল আল-আন্দালুস-যেখানে মুসলিম শাসন প্রায় আট শতাব্দী ধরে বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিল। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক ইবনে জিয়াদ জিব্রাল্টার প্রণালী পেরিয়ে স্পেন জয় করেন। তিনি অল্প সেনা নিয়ে গোথ রাজাকে পরাজিত করেন এবং দ্রুতই ইবেরীয় উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। এরপর থেকে কর্ডোবা, গ্রানাডা, সেভিয়া, টলেডো প্রভৃতি শহর জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আল-আন্দালুস ছিল মধ্যযুগের ইউরোপে শিক্ষার আলোকবর্তিকা। কর্ডোবার লাইব্রেরিতে লাখো বইয়ের সংগ্রহ ছিল, যেখানে গ্রিক, রোমান, আরবি ও হিব্রু ভাষার অসংখ্য জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষিত ছিল। চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, স্থাপত্য ও কৃষি বিজ্ঞানে মুসলিম পণ্ডিতরা অনন্য কীর্তি স্থাপন করেন।

আল-জাহরাবি (সার্জারির জনক), ইবনে রুশদ (Averroes), ইবনে হযম, ইবনে বতুতা প্রমুখ ব্যক্তিত্ব ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি স্থাপন করেন। স্পেন আজও মুসলিম ঐতিহ্যের স্থাপত্য-নৈপুণ্যে ভরপুর। আলহান্ত্রা প্রাসাদ (গ্রানাডা), কর্ডোবার মসজিদ, গিরালদা মিনার (সেভিয়া), আলকাজার প্রাসাদ প্রভৃতি স্থাপত্য বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। এসব স্থাপত্যে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা, আরবি ক্যালিগ্রাফি, পানির ফোয়ারা ও বাগান ইসলামী শিল্পকলার মহিমা তুলে ধরেছিল। মুসলিম ঐতিহ্যের লীলাভূমি স্পেন শুধু ইতিহাস নয়, এটি, এক সময় ছিল মানবসভ্যতার জ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক চিরন্তন বাতিঘর। সেই স্পেনকে তৃতীয় গ্লোবাল জালালাবাদ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। তৃতীয় আন্তর্জাতিক জালালাবাদ উৎসব ২০২৫ উপলক্ষে একটি স্মারক প্রকাশ করা হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। এই স্মারকটি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে প্রতিবারের মত যেমন তুলে ধরবে, তেমনই আমাদের মধ্যকার সম্প্রীতি-সহমর্মিতা, ভালোবাসা এবং হৃদ্যতার সম্পর্ক বাড়িয়ে দেবে। আমরা যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, আশা করি এই স্মারকটি তার কিছুটা হলেও পূরণ করবে। স্মারক প্রকাশ করতে যারা মূল্যবান লেখা, ছবি, বিভিন্ন তথ্য এবং বিজ্ঞাপন দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে আমাদের সম্পাদনা পরিষদ ও সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃ তজ্ঞতা। এছাড়া স্মারকটি সম্পাদনা, মুদ্রণ ও প্রকাশে যারা নিরলসভাবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। আন্তর্জাতিক জালালাবাদ উৎসব সফল ও সার্থক হোক। জালালাবাদবাসী ঐক্য ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকুক আজীবন। সবার জন্য শুভকামনা। আল্লাহ তায়া'লা সবাইকে ভালো ও সুস্থ রাখুন।